দৃষ্টিভঙ্গি কী? সুস্থ, সফল, সুখী জীবন গঠনে দৃষ্টিভঙ্গির ভূমিকা কী?

দৃষ্টিভঙ্গি কী? সুস্থ, সফল, সুখী জীবন গঠনে দৃষ্টিভঙ্গির ভূমিকা কী?

নিঃসন্দেহে আমরা প্রত্যেকেই সুস্থ, সফল ও সুখী জীবনের প্রত্যাশা করি। আর এ প্রত্যাশা অত্যন্ত যৌক্তিক। এখন যৌক্তিক এ চাওয়াগুলোকে জীবনে পাওয়ায় পরিণত করার জন্যে কী প্রয়োজন? বিত্ত বৈভব প্রতিপত্তি? ক্ষমতা? খ্যাতি? অপ্রতিরোধ্য পেশিশক্তি? অগাধ পান্ডিত্য? তথ্য-প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা? অতুলণীয় মেধা? না, এসব কিছুই নয়। এর জন্যে চাই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির রয়েছে সীমাহীন আকর্ষণী ক্ষমতা। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী ব্যাক্তির সুস্থতা, সাফল্য ও সুখী জীবনের জন্যে বিরামহীনভাবে কাজ করে প্রকৃতির নেপথ্য স্পন্দন। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানে হচ্ছে শোকরগোজার দৃষ্টিভঙ্গি। আর শোকরগোজার দৃষ্টিভঙ্গি লালন কারীর জন্যে বিশ্বপ্রকৃতির একচ্ছত্র অধিপতি অতীব ক্ষমাশীল পরম দয়ালু মহান স্রষ্টাই যথেষ্ট।

একটি ছোট্ট ছিদ্র যেমন বড় একটি জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে ঠিক তেমনি জীবনদৃষ্টিতে যদি ভুল থাকে সব থাকার পরেও একজন মানুষের জীবন অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। দৈনন্দিন জীবনের অনেক ছোটখাটো বিষয় থেকে শুরু করে যে-কোনো বড় সমস্যাকে আমরা মোড় ঘুড়িয়ে দিতে পারি যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা সঠিক হয়, ইতিবাচক হয়। আসলে ঘটনা যা-ই ঘটুক আমাদের দেখার প্রক্রিয়ার ওপর অর্থাৎ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করছে ঘটনাটি আমাকে সুখী করবে, না অসুখী করবে, আনন্দ দেবে নাকি দুঃখভারাক্রান্ত করবে।  

জীবনদৃষ্টি সঠিক হলে আপনি রক্ষা পাবেন হোঁচট খাওয়া থেকে, বেঁচে যাবেন ভুল করা থেকে। মনে প্রশান্তি থাকবে, সুখ থাকবে, শুকরিয়া থাকবে। সহজ স্বতঃস্ফূর্ততায় আপনি এগিয়ে যাবেন সফল জীবনের পথে। 

জীবন খুব সহজ কিন্তু এটিকে আমরা অযথাই জটিল করে তুলি। আসলে যে-কোনো সমস্যা সেটি আমার জন্যে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে না সংকটে রূপ নেবে তা নির্ভর করে আমার ওপর। সঠিক জীবনদৃষ্টি জীবনকে উপভোগ করতে শেখায় আর অবিদ্যাযুক্ত ভুল দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে অসুস্থ ও দুঃখী করে তোলে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, সঠিক জীবনদৃষ্টি কী? এককথায় উত্তর দিলে বলা যায়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করা। আরো সহজ করে বলতে গেলে যা সত্য, শাশ্বত ও কল্যাণকর তাকেই গ্রহণ করা।

দৃষ্টিভঙ্গি দু ধরনের :

১. ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

২. নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

ধরা যাক, কেউ একটি কাজ করতে গিয়ে শত চেষ্টার পরও ব্যর্থ হয়েছে, যিনি এ ঘটনাকে নেতিবাচকভাবে নেবেন, তিনি হতাশায় নিমজ্জিত হবেন, ব্যর্থতার ভয় তাকে পেয়ে বসবে এবং পরবর্তীতে তিনি আর কাজ শুরু করতে পারবেন না। আর যিনি ইতিবাচক তিনি জানেন, ব্যর্থতার মাঝেই সুপ্ত আছে সাফল্যের বীজ। যে মাটিতে পড়ে গেছেন সেই মাটি ধরেই তিনি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন এবং ক্রমাগত চেষ্টার ফলশ্রুতিতে তিনি একসময় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য লাভ করেন।

আবার ধরুন, পরিবারে ‘আমি কী পেলাম বা অন্যেরা আমাকে বুঝল না’ এ ধরনের মানসিকতা যারা লালন করেন তাদের অধিকাংশই রাগ-ক্ষোভ, অভিমান, ঈর্ষা কিংবা দুঃখবোধে ভোগেন। কিন্তু সেই ব্যক্তিই যদি চিন্তা করেন ‘আমি কী দিতে পারি, আমি অন্যদেরকে কীভাবে বুঝতে পারি’-এভাবে চিন্তা করেন তাহলে সম্পর্কের ফাঁকগুলো কমে যায়। তিনিও যেমন প্রশান্তিতে থাকতে পারেন এবং পরিবারের জন্যে তিনিও হন প্রশান্তির উৎস।

আসলে যিনি সবকিছু ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন তিনি সাফল্যকে আমন্ত্রণ করেন আর যিনি নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন তিনি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হন।  

ইতিবাচকতা (সঠিক জীবনদৃষ্টি) মানে বিশ্বাস করা যে পৃথিবীতে সবকিছুর মধ্যে ভালো বলে একটা ব্যাপার আছে। যারা ইতিবাচক, শত দুঃখকষ্টেও তারা কৃতজ্ঞচিত্ত। আর যারা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে তারা সবকিছুতে খুঁত খুঁজে বের করে। হবে না, পারব না, হতাশা, হীনম্মন্যতা তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। 

এখন কথা হচ্ছে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক আছে কিনা তা বুঝব কীভাবে?

  • জীবনের যে-কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি কিনা? বর্তমান পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন জীবনে ভালো কিছু ঘটবে, আমার জন্যে ভালো কিছু অপেক্ষা করছে এই বিশ্বাস মনের ভেতরে গেঁথে নিতে পারি কিনা? নিজের সামর্থ্য ও শক্তির ওপর আস্থা আছে কিনা?
  • যা আছে তা নিয়ে শোকরগোজার থাকতে পারি কিনা এবং কী কী নেই তা নিয়ে হা-হুতাশ না করে যা আছে তা নিয়েই সুপরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করতে পারি কিনা?
  • সর্বাবস্থায় নিজের লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে আচরণ ও কর্মপন্থা অবলম্বন করতে পারি কিনা?

জীবনদৃষ্টি যখন সঠিক হবে তখন আমরা সবকিছুতেই আশার আলো দেখতে পাব। আলোকিত মানুষ গড়ার অগ্রপথিক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘একটি গাড়ি পাহাড় বেয়ে উঠছে ওপরের দিকে। আপনি কী বলবেন? গাড়িটা উঠছে। ওপরে যাচ্ছে অর্থাৎ উত্থান হচ্ছে। কিন্তু গাড়িটা যখন আবার পাহাড় পার হয়ে নিচের দিকে নামে তখন কি আপনি বলতে পারবেন যে, ওর পতন হচ্ছে? না, কখনোই তা নয়। কারণ গাড়িটা নিচের দিকে নামলেও ওর চাকাটা সামনের দিকে। তাহলে তো এগোচ্ছে। সুতরাং আপাতদৃষ্টিতে যাকে আমরা নৈরাশ্য বলে মনে করছি অর্থাৎ পতন মনে করছি, সেটা তো আসলে সামনের আরেকটি পাহাড়ে উঠবে বলে। সেটা তো তাহলে উত্থান।’

আশা মানেই অগ্রযাত্রা, আশা মানেই সৃষ্টি। আসলে জীবন যে-কোনো পর্যায় থেকে শুরু করা যায়। যতক্ষণ শ্বাস আছে ততক্ষণ যেন আশার সলতেটা জ্বালিয়ে রাখতে পারি। এই আশাবাদ বা ইতিবাচকতা জীবনের ব্যাপারে, স্বাস্থ্যের ব্যাপারে, পরিবারের ব্যাপারে এবং কর্মজীবনে অর্থাৎ সামগ্রিক জীবনে লালন করতে হবে। 

পৃথিবীতে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থই এসেছে মানুষকে সঠিক জীবনদৃষ্টির শিক্ষা দিতে, মানুষকে সত্য ও সাফল্যের সরলপথে পরিচালিত করতে। 

জীবনদৃষ্টি সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল কোরআনে পরম করুণাময় আল্লাহ বলেছেন, ‘ভেতর থেকে না বদলালে অর্থাৎ দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে আল্লাহ কোনো জাতি বা মানুষের অবস্থা বদলান না।’ (রাদ : ১১)

পবিত্র ধম্মপদে মহামতি বুদ্ধ বলেন, আমাকে বকেছে, আমাকে মেরেছে, আমার জিনিস কেড়ে নিয়েছে-এমন চিন্তা বা অভিযোগ যারা করে, ঘৃণা ও শত্রুতা তাদের চিরসঙ্গী হয়। আর যারা এরূপ চিন্তা করে না তাদের ঘৃণা ও শত্রুতা দ্রুত উপশম হয়।’[যমকবগ্গো : ৩-৪]

বোখারী শরীফের প্রথম হাদীস হচ্ছে-‘ইন্নামাল আমালু বিন নিয়াত’। এটার অনুবাদ হচ্ছে ‘নিয়ত সকল কর্মের অঙ্কুর’। অমর কথাশিল্পী রুশ মনীষী লিও টলস্টয় সঠিক জীবনদৃষ্টির নাম দেন-‘The Science of Living’ বা ‘জীবনযাপনের বিজ্ঞান’। তিনি বলেন, Most important of all the sciences one can and must have to learn is the science of living, so as to do the least evil and the greatest possible good.’

জীবনদৃষ্টি সঠিক করতে পারলে কী হয়?

স্রষ্টা আমাদের এক বিস্ময়কর জৈব কম্পিউটার ব্রেন দিয়েছেন। এই ব্রেন কম্পিউটারের চেয়ে ১০ লক্ষ গুণ বেশি শক্তিশালী। ব্রেন হলো কম্পিউটারের হার্ডওয়ার আর মন হচ্ছে সফটওয়্যার। মনই ব্রেনকে পরিচালিত করে। আর মন পরিচালিত হয় দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা। দৃষ্টিভঙ্গি যদি সঠিক হয়, তবে ব্রেনের নিউরোনে নতুন ড্রেনড্রাইট সৃষ্টি হয়ে নতুন বাস্তবতা উপহার দেয়। আর দৃষ্টিভঙ্গি যদি হয় ভুল বা নেতিবাচক, তবে সে ভুলের এবং অকল্যাণের বাস্তবতাই সৃষ্টি হয়।

তাই জীবনকে গ্রহণ করতে হবে পরিপূর্ণরূপে। এর জন্যে প্রথম প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও ইতিবাচক প্রয়াস। আর এটা অত্যন্ত স্বার্থকভাবে করতে পারে ধ্যান বা মেডিটেশন।

মেডিটেশনের কারণে সবসময়ে ইতিবাচকতার অনুরণনে থাকার ফলে দেহ ও মনে সুস্থতার একটি স্পন্দন সৃষ্টি হয়, ফলে তিনি খুব সহজেই শতকরা ৭৫ ভাগ মনোদৈহিক রোগ থেকে মুক্তি পান। দেহ মনে প্রশান্তি ও ইতিবাচকতা এবং সঠিক জীবনদৃষ্টি লাভ করার ফলে তিনি হয়ে ওঠেন আশপাশের সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রেনের যে অংশে আনন্দ উদ্দীপক হরমোন সৃষ্টি হয় নিয়মিত মেডিটেশন করলে আমাদের মস্তিস্কের সেই অংশটি বেশি সক্রিয়। জীবন একটাই। এই জীবনকে সর্বোচ্চ মহিমায় সাজাতে জীবনযাপন ও ভালো থাকার বিজ্ঞানকে জানা ও নিয়মিত চর্চা  করা আবশ্যক। পরম করুণাময় আমাদের সকল সৎপ্রয়াসকে কবুল করুন। আমীন।

2 thoughts on “দৃষ্টিভঙ্গি কী? সুস্থ, সফল, সুখী জীবন গঠনে দৃষ্টিভঙ্গির ভূমিকা কী?

Leave a Reply

Your email address will not be published.