সুস্থতার জন্যে পারিবারিক ও সামাজিক অটুট বন্ধনের ভূমিকা কী?

সুস্থতার জন্যে পারিবারিক ও সামাজিক অটুট বন্ধনের ভূমিকা কী?

কানাডীয় মনোবিদ সুজান পিংকারের গবেষণা মতে, যখন একজন মানুষ তার মমতা, আন্তরিকতা, ভালবাসা নিয়ে আরেকজন মানুষের সাথে হাত মেলায়, আন্তরিক শুভেচ্ছা বিনিময় করে, মুখোমুখি বা পাশাপাশি বসে কথা বলে তখন ব্রেনে অক্সিটোসিন প্রবাহের সূত্রপাত ঘটে, যা দেহে স্ট্রেস সৃষ্টিকারী হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমানোর মাধ্যমে স্ট্রেস কমায়। বাড়ায় সুখানুভূতি। তার দেহে ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটে। এবং ডোপামিন প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মরফিনের মতো তার ব্যথা-বেদনাকে, দুঃখকে দূর করে। সুস্থতার জন্যে শরীরে অক্সিটোসিন, ডোপামিন, এন্ডোরফিনের প্রবাহ খুবই গুরুত্বপূর্ন। পারিবারিক ও সামাজিক অটুট বন্ধন এই সুখ সৃষ্টিকারী হরমোন সমুহের প্রবাহকে বৃদ্ধি করতে বিশেষ ভুমিকা রাখতে পারে।

পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে দৃঢ় করে তুললে কেন সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন প্রিয়জন ও নিকটজনের সাথে আপনার সম্পর্কগুলো সুন্দর থাকে, স্ট্রেস হ্রাসকারী হরমোন নিঃসৃত হয়। যদি সম্পর্কগুলোর মাঝে দেয়াল উঠতে শুরু করে কিংবা অবহেলায় মরিচা পড়তে শুরু করে তখন স্ট্রেস বর্ধনকারী হরমোন নিঃসৃত হয়। করোনারি ধমনী, পাকস্থলী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একে একে ঘায়েল হতে থাকে। যমদূতও দাঁত কেলিয়ে থাবা বাড়িয়ে ধরতে ছুটে আসবে। 

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, কয়েক ডজন গবেষণায় প্রমাণিত যে যারা পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে মজবুত রেখেছে তারা কম অসুস্থ হয় ও দীর্ঘজীবী হয়। অন্যদিকে যাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো নাজুক ও ঠুনকো হয়ে গেছে ডিপ্রেশন ও মস্তিষ্কের বয়সজনিত রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি তাদের ক্ষেত্রে বেশি। একটি সমীক্ষায় গবেষকরা তিন লক্ষ নয় হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য যাচাই করেন। তারা জানান, নাজুক পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক মৃত্যুঝুঁকি (the risk of premature death from all causes) ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।  

বোখারী শরীফের ২০৬৭ নম্বর হাদীস হচ্ছে, আনাস (রা) বর্ণিত যে, রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন যে-কোনো মানুষ যে নিজের উপার্জনের প্রবৃদ্ধি ঘটাতে চায় এবং সুস্থতা-আয়ু বৃদ্ধি কামনা করে সে যেন স্বজন ও পরিজনদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।

একটু আগে আমরা বলেছি যে, এই সুসম্পর্ক দেহে ডোপামিনের নিঃসরণ বাড়ায়। এই ডোপামিন হচ্ছে দেহের নিজস্ব মরফিন। আসলে একজন মানুষের ভেতরে যখন আনন্দ ভাব সঞ্চারিত হয় তখন তার ব্রেন, তার মস্তিষ্ক সবচেয়ে সুন্দরভাবে কাজ করে। এবং ব্রেন যখন সুন্দরভাবে কাজ করে তখন তা দেহের যেরকম কল্যাণ সাধন করে, দেহের রোগমুক্তির প্রক্রিয়া যেরকম সক্রিয় হয়ে ওঠে তেমনি এই মস্তিষ্ককে ব্যবহার করে তার প্রাচুর্য, সাফল্য ও সমৃদ্ধি বাড়তে থাকে। 

আসলে আমাদের প্রিয় নবী যে উপদেশ দিয়ে গেছেন আমাদের সেই উপদেশেরই পুনরাবৃত্তি করছেন এখনকার সমাজবিজ্ঞানী মনোবিজ্ঞানী চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। তবে এই যোগাযোগ হতে হবে সরাসরি, বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ। প্রয়োজনে কখনো ফোন বা মেইল করতে হলেও কাছাকাছি বা দূরের ঠিকানা সাপেক্ষে নিয়মিত বিরতিতে দিনে বা সপ্তাহে বা মাসে যেন সশরীরে দেখা হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

নিঃসঙ্গ, একাকী বলতে সাধারণত আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বার্ধক্যপীড়িত একজন মানুষের ছবি। বিবিসি-র করা একাকিত্ব-বিষয়ক অনুসন্ধানের ফলাফল কিন্তু বলছে ভিন্ন কথা-বয়োজ্যেষ্ঠদের তুলনায় এখন তরুণরাই বেশি নিঃসঙ্গ অনুভব করে। বিশ্বব্যাপী ৫৫ হাজার মানুষের ওপর চালানো এ জরিপ অনুযায়ী, ৭৫-এর অধিক বয়সীদের মধ্যে নিঃসঙ্গ অনুভব করেন ২৭% মানুষ। অন্যদিকে ১৬-২৪ বছর বয়সীদের মাঝে একাকিত্বের হার ৪০%! 

স্কুল-কোচিং-বাসা। শিশু-কিশোরদের জীবন এখন এটাই। কু-সঙ্গের আশঙ্কায় সন্তানের কোনো বন্ধু না থাকাটাই এখন অভিভাবকদের প্রত্যাশা। নিউক্লিয়ার এ পরিবারগুলোতে সঙ্গী হিসেবে অনেকগুলো ভাইবোন পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। আর এভাবেই বেড়ে উঠছে নিঃসঙ্গ এক প্রজন্ম। ফোর্বস-এর মতে, এভাবে চলতে থাকলে নিঃসঙ্গতা হয়ে উঠতে পারে আগামী বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানসিক সমস্যা। কারণ সিংহভাগ মানসিক অসুস্থতার প্রধান উৎস এই একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুভূতি পরবর্তীতে হতাশা, বিষণ্নতা, আত্মহত্যা-প্রবণতাসহ বিভিন্ন ধরনের মনোদৈহিক রোগের জন্ম দেয়। কারণ, মনের প্রভাব শরীরের ওপর পড়ে। মন যদি হতাশা, বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়, দেহ তখন ভারাক্রান্ত হতে বেশি দেরি করে না।

জার্নাল অব হেলথ এন্ড সোশ্যাল বিহেভিয়ার এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভঙ্গুর সামাজিক যোগাযোগ অথবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা উপর্যুপরি হার্ট এটাক, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দেয় এবং সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ সম্পর্কে সর্বশেষ গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশিত হয় বিজ্ঞানীদের সাময়িকী সাপ্তাহিক নিউ সায়েন্টিস্টের ১২ই আগস্ট ২০২০ সংখ্যায়। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, A lack of social connection presents as large a risk to our health as obesity or smoking up to 15 cigarettes a day. অর্থাৎ দিনে ১৫টি সিগারেট খেলে সুস্থতার ওপর, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর যে শারীরিক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা একজন মানুষের শরীরের ওপর সেরকম ক্ষতিকর প্রভাবই সৃষ্টি করে।

তাই শুকিয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলোর গোড়ায় পানি ঢালতে শুরু করে দিতে হবে। যদি আন্তরিক মমতা ও মনোযোগ দেয়া যায়, শিগগিরই সম্পর্কগুলো আবার সজীব উষ্ণ প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। সুস্থ থাকার জন্যে সুখী বন্ধন সৃষ্টি করতে হবে নিজ পরিবারে, আত্মীয়-বন্ধু-প্রতিবেশীদের সাথে। হেলেন কেলারের একটি কথা আছে-সুখ আপনিই আসে না, একে তৈরি করে নিতে হয়। সাম্প্রতিককালে মনোবিজ্ঞানী আর গবেষকরাও বলছেন অনেকটা সেরকম কথাই। তাদের মতে, দৈনন্দিন জীবনে কিছু আপাত সাধারণ আচরণ বৈশিষ্ট্যই আমাদের সুখী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। 

ধরুন, যে পরিবারে ছোট-বড় সবার মাঝে সালাম আগে দেয়ার চর্চা আছে সে পরিবারে সুখ থাকবেই। যে পরিবারের সদস্যরা অনেক ব্যস্ততার পরও যখন অন্তত একবেলার খাবার একসাথে খান, সে পরিবারের বন্ধন অবশ্যই বেশি। সহজ ভাষায় আমরা বলতে পারি যে, যদি বন্ধন সৃষ্টি করতে চাই, যদি চাই বন্ধনকে ধরে রাখতে তাহলে আমাদের পরিজনদের সাথে, আমাদের আত্মীয়দের সাথে, আমাদের বন্ধুমহলে, আমাদের প্রতিবেশীদের প্রতি শুদ্ধাচারী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। যত আমরা তার প্রতি সম্মান, তার প্রতি মমতা নিয়ে শুদ্ধাচারের চর্চা করতে পারব, তত আমরা কাছাকাছি থাকতে পারব, তত আমাদের মেধা বিকশিত হবে, মন প্রফুল্ল থাকবে, শরীর প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

আসলে একটু ভালো কথা, একটু হাসি, একটু ভালো ব্যবহার আমাদেরকে মানুষের মনের মণিকোঠায় ঠাঁই দিতে পারে। পারে তার হৃদয়ে আসন করে নিতে। পরিবারে ও পরিবারের বাইরে যে-কোনো পরিমণ্ডলে ছোট-বড় সবার সাথে হাসিমুখে আগে সালাম দেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে আমরা যেন সবসময় চেষ্টা করি। সেইসাথে বন্ধনকে দৃঢ় করতে আরো যা যা করতে পারি তা হলো :

  • বাসা থেকে বের হবার সময় সম্ভব হলে মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী বা অন্য সদস্যদের বলে বের হবো। 
  • বাসায় ফিরে সবার খোঁজ নেবো।
  • দিনের অন্তত কিছুটা সময় পরিবারের জন্যে নির্দিষ্ট রাখব। মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনব।
  • যত ব্যস্ততাই থাকুক, প্রতিদিন অন্তত একবেলা পরিবারের সদস্যরা সবাই মিলে খাবার গ্রহণ করব।
  • সপ্তাহে একদিন একসাথে পারিবারিক মেডিটেশন করব।
  • আপনজনের প্রতি ক্ষোভ-অভিমান জমিয়ে রাখব না। সরাসরি কথা বলব, মমতার সাথে।
  • প্রতিবেশী/ সহকর্মীর আনন্দে শরিক হবো। বিপদে যথাসাধ্য পাশে দাঁড়াব। অসুস্থ হলে দেখতে যাবো।
  • পারিবারিক বা সামাজিক পরিমণ্ডলে কেউ মন্দ ব্যবহার করলে আমরা সবসময় ভালো আচরণ করব।

আসলে এগুলো নতুন কোনো কথা নয়। আমরা আগেও শুনেছি, আগেও জানতাম। এখন শুধু দরকার কথাগুলো চর্চা করার। তাই যত বেশি সম্ভব কথাগুলো মনে রাখব, চর্চা করব। এই চর্চা আমাদের জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি, সাফল্য ও প্রাচুর্য সৃষ্টি করবে যদি আমরা মেডিটেশন চর্চা করাকেও প্রতিদিনের রুটিনে যুক্ত করি। তাহলে সুস্থ থেকে ব্যস্ত হয়ে কর্মময় একটি জীবন আমরা যাপন করতে পারব। মেডিটেশন বা ধ্যানচর্চা যে-কোনো ভালো পরিবর্তনে অভ্যস্ত হতে এবং পরিবর্তনের সুফলকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.